দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইসলাম মানুষকে হালাল পথে জীবিকা উপার্জনের প্রতি উৎসাহিত করেছে। শ্রম, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, চাকরি কিংবা বৈধ যেকোনো পেশার মাধ্যমে উপার্জিত রিজিক মানুষের জীবনকে স্বচ্ছল করে এবং পরিবার ও সমাজের কল্যাণে ভূমিকা রাখে।
তবে জীবিকা অর্জনের ক্ষেত্রে ইসলাম হালাল-হারামের সুস্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করেছে। এমন কিছু পেশা ও কর্মকাণ্ড রয়েছে, যেগুলো ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের নৈতিকতা, ঈমান ও মূল্যবোধকে ধ্বংস করে। তাই এসব কাজ থেকে উপার্জন করাও ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনিই তোমাদের জন্য জমিনকে সুগম করে দিয়েছেন।
অতএব, তোমরা এর দিক-দিগন্তে বিচরণ করো এবং তাঁর দেওয়া রিজিক থেকে আহার করো।’ (সুরা : মুলক, আয়াত : ১৫) যে পাঁচ পেশা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। সেগুলো হলো-
১. সুদের কারবার
ইসলামে সুদ সম্পূর্ণ হারাম। আল্লাহ তাআলা সুদকে নিষিদ্ধ করেছেন এবং বৈধ ব্যবসাকে অনুমোদন দিয়েছেন।
পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৫)
সুদের ভয়াবহতা এত বেশি যে, এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তিদের ব্যাপারেও রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদগ্রহীতা, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং এর দুই সাক্ষীর ওপর লানত করেছেন এবং বলেছেন, ‘তারা সবাই সমান।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৫৯৮)
তাই সুদ খাওয়া যেমন হারাম, তেমনি সুদি লেনদেন পরিচালনা, লিখন, সাক্ষ্যদান কিংবা প্রত্যক্ষ সহযোগিতার মাধ্যমে সুদের কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নেওয়াও গুরুতর অপরাধ।
২. মদ ও মাদকদ্রব্যের ব্যবসা
মদ ও নেশাজাতীয় দ্রব্য মানুষের বিবেক, স্বাস্থ্য, পরিবার ও সামাজিক মূল্যবোধ ধ্বংস করে।
তাই ইসলাম শুধু মদ পান করাকেই নিষিদ্ধ করেনি; বরং এর উৎপাদন, বিক্রি, বহন, পরিবেশন ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসাকেও নিষিদ্ধ করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মদের ওপর দশজনের প্রতি লানত করা হয়েছে’—এর মধ্যে রয়েছে মদ প্রস্তুতকারী, যার জন্য প্রস্তুত করা হয়, পানকারী, বহনকারী, যার কাছে বহন করা হয়, বিক্রেতা, ক্রেতা, মূল্যগ্রহীতা ও পরিবেশনকারীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। (তিরমিজি, হাদিস : ১২৯৫)
সুতরাং মদ বা নেশাজাতীয় দ্রব্যের উৎপাদন, বিপণন কিংবা পরিবেশনের মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করা একজন মুসলমানের জন্য বৈধ নয়।
৩. পতিতাবৃত্তি ও ব্যভিচার করা
ইসলাম মানুষের সম্মান, পরিবার ও বংশপরিচয় রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। এ কারণে ব্যভিচার ও এর সঙ্গে সম্পর্কিত সব ধরনের কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৩২)
অতএব যৌনতার বিনিময়ে অর্থ উপার্জন, পতিতাবৃত্তি পরিচালনা, এতে কাউকে বাধ্য করা কিংবা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করা ইসলামে হারাম। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তোমাদের দাসীদের পার্থিব জীবনের সম্পদ লাভের আকাঙ্ক্ষায় ব্যভিচারে বাধ্য করো না, যদি তারা সতীত্ব রক্ষা করতে চায়।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩৩)
এ আয়াত মানবসম্মান ও নারীর মর্যাদা রক্ষায় ইসলামের সুস্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরে।
৪. অশ্লীলতানির্ভর বিনোদন
যে ধরনের কাজ মানুষের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেয়, যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি করে কিংবা ব্যভিচারের দিকে মানুষকে ধাবিত করে—সেসব কর্মকাণ্ড ইসলামের নৈতিক শিক্ষার পরিপন্থী। যৌন আবেদনময় নৃত্য, নগ্নতা প্রদর্শন, অশ্লীল অভিনয় এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করা থেকে মুসলমানকে বিরত থাকতে হবে। কারণ ইসলাম শুধু ব্যভিচার নিষিদ্ধ করেনি; বরং ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যায় এমন পথও বন্ধ করতে নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট পথ।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৩২)
এ থেকে বোঝা যায়, একজন মুমিনের দায়িত্ব শুধু নিজে অশ্লীলতা থেকে বেঁচে থাকা নয়; বরং নিজের পেশা ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অন্যদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেওয়া থেকেও বিরত থাকা।
৫. প্রাণীর মূর্তি নির্মাণ করা
প্রাণীর আকৃতির মূর্তি ও ত্রিমাত্রিক প্রতিকৃতি নির্মাণের ব্যাপারে ইসলামী শরিয়তে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একাধিক হাদিস রয়েছে। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি প্রতিকৃতি নির্মাণ করে জীবিকা উপার্জন করতেন। তখন ইবনে আব্বাস (রা.) তাকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বক্তব্য শোনান, ‘যে ব্যক্তি কোনো প্রতিকৃতি তৈরি করে, আল্লাহ তাকে শাস্তি দেবেন, যতক্ষণ না সে তাতে প্রাণ সঞ্চার করে; আর সে কখনো তাতে প্রাণ সঞ্চার করতে পারবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২২২৫)
তবে এ বিষয়ে শরিয়তের বিভিন্ন দলিল ও ফকিহদের আলোচনায় ছবি, আলোকচিত্র, ডিজিটাল ছবি, শিক্ষামূলক চিত্র ইত্যাদির ক্ষেত্রে বিস্তারিত পার্থক্য রয়েছে। তাই সব ধরনের আধুনিক ছবি বা চিত্রকর্মকে একই বিধানের অন্তর্ভুক্ত করা সঠিক নয়। বিশেষ করে প্রয়োজনীয়, উপকারী ও শরিয়তসম্মত চিত্রের বিধান আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হয়।
ইসলাম মানুষের জন্য রিজিকের দরজা বন্ধ করেনি; বরং হালাল উপার্জনের অসংখ্য পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, কারিগরি কাজ, শিক্ষা, চিকিৎসা, চাকরি, শিল্প ও বিভিন্ন বৈধ পেশার মাধ্যমে মানুষ সম্মানজনকভাবে জীবিকা অর্জন করতে পারে। তাই হারাম পেশার পেছনে ছুটে সাময়িক লাভ অর্জনের পরিবর্তে হালাল ও পবিত্র উপার্জনের পথ বেছে নেওয়াই একজন মুমিনের কর্তব্য।
কেএম